আধিপত্য যখন হেজিমনি

হেজিমনি (Hegemony) শব্দটির সঙ্গে আমরা কম-বেশি পরিচিত। ধারণা থাকলেও এ বিষয়ে বিশদে অনেকেরই অজানা। ফলে শব্দটি দিয়ে কী বোঝাতে চাইছে, তা বোঝা গেলেও ব্যাখ্যা করতে গেলেই মুশকিলে পড়তে হয়। প্রকৃত অর্থে বাংলায় এর সঠিক প্রতিশব্দ নেই। তবে বাংলা ভাষায় এর অর্থ বোঝাতে ‘নেতৃত্ব’, ‘কর্তৃত্ব’, ‘প্রাধান্য’, ‘আধিপত্য’ শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে মূল শব্দটির সবচেয়ে কাছাকাছি বাংলা প্রতিশব্দটি হলো ‘আধিপত্য’। তবে মূল বাংলা ‘আধিপত্য’ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দটি হলো ‘Domination’। Domination ও Hegemony শব্দদুটি গুণগত পার্থক্য বিস্তর। শব্দদুটির কর্মকৌশলও ভিন্ন। উদাহরণ হিসেবে—‘Hegemony refers to a kind of domination’—এই কথাটির বাংলা করতে গেলে কিছুটা জটিলতায় পড়তে হবে! এক্ষেত্রে Hegemony-কে আধিপত্য ও Domination-কে কর্তৃত্ব রূপে অনূদিত করতে হবে। ফলে ইংরেজিতে হেজিমনি যে ব্যাপক রাজনৈতিক অর্থে ব্যবহৃত হয়, বাংলায় আধিপত্য দিয়ে ততটা ব্যাপকতা বোঝায় না। এজন্য অনেক রাজনৈতিক তাত্ত্বিক বা বিশ্লেষক শব্দটির বিস্তৃতি বোঝাতে বাংলায় সরাসরি ‘হেজিমনি’ শব্দটিই ব্যবহার করে থাকেন। এ প্রসঙ্গে শোভনলাল দত্তগুপ্ত ‘ধনতন্ত্র হেজিমনি ও নৈতিকতা : গ্রামশি ও আলথুসার’ প্রবন্ধে বলেন:[১]

গ্রামশি এই বিষয়টা খুব ভালো ধরেছেন, যেটা লেনিন বা পরবর্তীকালের চিন্তকদের চোখ এড়িয়ে গেছে। গ্রামশি বলছেন যে,এদের তো বলপ্রয়োগ করে, চোখ রাঙিয়ে মানুষকে শাসন করার প্রয়োজন নেই। এটা অনেকটা অভিমন্যুর চক্রব্যূহে প্রবেশের মতো। একবার আপনাকে ক্ষমতার বৃত্তে ঢুকিয়ে দিতে পারলে আপনি ঐ খোপেই থেকে যাবেন। গ্রামশি একটা গুরুত্বপূর্ণ তফাত করেছিলেন, আধিপত্য (হেজিমনি) আর কর্তৃত্বের (ডমিনেশন) মধ্যে। হেজিমনির মাধ্যমে সুনিশ্চিত হয় জনগণের সম্মতি আর ডমিনেশন প্রশ্রয় দেয় দাপট দেখাবার রাজনীতিকে। কমিউনিস্ট পার্টি হেজিমনির ভাবনা ছেড়ে ডমিনেশনের ভাবনাকে বড় করে দেখে বলেই নিজেকে জড়িয়ে ফেলে ক্ষমতা প্রদর্শনের ভাবনার সঙ্গে আর ডেকে আনে তার নিজের ও সমাজের গভীর সংকট।

ভাষার এই বিতর্ক আজকের আলোচ্য নয়। চলুন হেজিমনি বা আধিপত্যকে ব্যবচ্ছেদ করা যাক।

হেজিমনি শব্দটির ইতিহাস

১৫৬৭ খ্রিষ্টাব্দে হেজিমনি শব্দটির প্রথম ব্যবহার দেখা যায়—জন ম্যাপলেটের দর্শন বিষয়ক লেখায়।[২]শব্দটির দুটি উৎসের সন্ধান পাওয়া যায়—ল্যাটিন ও গ্রিক ভাষা থেকে।[৩]ল্যাটিন hēgemonia (হেজিমোনিয়া) অর্থ নেতৃত্ব এবং গ্রিক ἡγεμονία (হেজিমোনিয়া) অর্থ sovereignty বা সার্বভৌমত্ব। শুরুতে হেজিমোনি বিশেষভাবে প্রাচীন গ্রিক রাষ্ট্রগুলির নিয়ন্ত্রণ বোঝাতে ব্যবহৃত হত; পরে এটি অন্যান্য রাজনৈতিক ভাষ্যে আধিপত্যের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। উনবিংশ শতাব্দীতে শব্দটি ভিন্ন একটি অর্থ তৈরি করে—যা প্রভাববিস্তারকারী কারো দ্বারা অন্যান্যদের উপর সামাজিক বা সাংস্কৃতিক প্রভাবকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

হেজিমনির তত্ত্বায়ন

উনবিংশ শতকে মার্কসের লেখায় হেজিমনির প্রাথমিক আলোচনা ও পরে প্লেখানভের লেখায় এর বিশদ ধারণা পাওয়া যায়। বিংশ শতকের শুরুতে লেনিন তাঁর “What Is To Be Done?” বইয়ে হেজিমনিকে কর্তৃত্ব হিসাবে আখ্যা দেন। তবেইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসিকারারুদ্ধ অবস্থায় লেখা “Prison Notebooks” বইয়েহেজিমনির ধারণাকে তত্ত্বায়ন করেছেন। হেজিমনি হলোনেতৃত্ব ও আধিপত্যের একটি ধারণা, যা তৈরি করেনৈতিক ও বৌদ্ধিক নেতৃত্ব (moral and intellectual leadership)। তিনি দেখান—রাষ্ট্র ও প্রলেতারিয়েতের মধ্যে দ্বন্দ্ব কেবল শাসন-প্রতিবাদ বা অর্থনৈতিক বৈরিতাই নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়েও অব্যাহত থাকে। তিনি বলেন, শাসকবর্গ তাদের আধিপত্য ধরে রাখতে কেবল বলপ্রয়োগ করেই ক্ষান্ত হন না; তারা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, উপাসনালয়, গণমাধ্যম ও নাগরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে একটি সম্মিলিত সামাজিক চেতনা গড়ে তোলে যা তাদের আধিপত্যকে স্বাভাবিক ও অপরিহার্য হিসেবে প্রতীয়মান হয়। ফলত কর্তৃত্ব আরোপ বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে যে উদ্দেশ্য হাসিল করা কঠিন, তা হেজিমনি বা আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে সমাজ বা রাষ্ট্রে সাধন করা সহজতর হয়। গ্রামসির মতে, হেজিমনি হলো সেই ক্ষমতা যার মাধ্যমে একটি গোষ্ঠী

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice